বাঙালির অর্থনৈতিক জীবন ও প্রাসঙ্গিক শব্দাবলী

আজকে আমাদের আলোচনার  বিষয় -বাঙালির অর্থনৈতিক জীবন ও প্রাসঙ্গিক শব্দাবলী

বাঙালির অর্থনৈতিক জীবন ও প্রাসঙ্গিক শব্দাবলী

ক. ভূমিকা

বিংশ শতাব্দী শেষ হয়ে একবিংশ শতাব্দীর দুই বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ইউরোপে শিল্পবিপ্লব ঘটেছে বহু বছর আগে। ২০০৩ সালে বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাস লিখতে হলে অবশ্যই শুরু করতে হবে এই বাকাটি দিয়ে বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ, এর সাথে যোগ করা যেতে পারে আরেকটি বাক্য- ‘বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোকই কৃষিজীবী’। কৃষিনির্ভর সভ্যতা ভালো কী মন্দ এই প্রসঙ্গ অবান্তর।

একথা অনস্বীকার্য চাকুরীনির্ভর নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠলেও শতকরা ৯০ ভাগের বেশি জনগণের এখনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে গ্রামনির্ভর কৃষি সভ্যতার সঙ্গে। সোজা কথায় বাংলাদেশের পারিবারিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ সচিবালয়ের প্রধান সচিবেরও গ্রামের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক থাকার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

তাঁর এক ভাই হতে পারেন প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক, অন্য এক ভাই হতে পারেন নিরক্ষর কৃষিজীবী। তাঁকে ‘চাষাভুষা’ বলে প্রতিবেশী কোনো ধনী ব্যক্তি টিপ্পনীও কাটতে পাবেন। যেহেতু বাংলাদেশ এখনও কৃষিপ্রধান দেশ সেহেতু কৃষিকেন্দ্রিক প্রচুর শব্দ রয়েছে বাংলা বুলিভাণ্ডারে।

উল্লেখযোগ্য শব্দসমূহ হচ্ছে- জমি, চাষী, চাষাবাদ, লাঙল, জোয়াল, মই, মই দেওয়া, বীজবপন, গরু, মহিষ, ক্ষেতমজুর, বর্গাচাষী, ভাগচাষী, তেভাগা, নিড়ানো, ধানমাড়াই, সেচ, ইরিগেশন, ডিপটিউবওয়েল, শ্যালো, সার, গোবর সার, ফারটিলাইজার, ইউরিয়া, কীটনাশক, গ্যাস, বায়ুগ্যাস ইত্যাদি। তাছাড়া রয়েছে কাকতাড়ুয়া, রবিশস্য, একফসলী, দুফসলী, হালিয়া, কৃষিবিদ, গোলাঘর,

শস্যভাণ্ডার ইত্যাদি। ভাগচাষী বা বর্গাচাষী ইঙ্গিত দিচ্ছে অন্যের জমি চাষ করার প্রথা। লাঙল যার জমি তার নয়। জমি একজনের, লাঙল গরু আরেকজনের। উৎপন্ন ফসল সমানভাগে ভাগ করে নেয়ার প্রথা। তেভাগা শব্দ বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। তে+ভাগ+আ= তেভাগা। তে অর্থ তিন।

উত্তরবঙ্গের তেভাগা আন্দোলনের ফলে জন্ম লাভ করেছে তেভাগা শব্দটি। এর অর্থ উৎপাদিত ফসল তিন ভাগে ভাগ করা হবে। এর এক ভাগ পাবে মালিক, আর দুভাগ পাবে কৃষক। তেভাগা শব্দটি অভিধানে সংযোজিত হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ তেমন একটা নেই ।

 

বাঙালির অর্থনৈতিক জীবন ও প্রাসঙ্গিক শব্দাবলী

 

খ. জমির মালিকানা সংক্রান্ত শব্দ

কৃষিনির্ভর দেশে অধিকাংশ ব্যক্তির আয় জমির মালিকানার উপর নির্ভর করে। ফলে বাংলায় জন্ম লাভ করেছে জমির মালিকানাকেন্দ্রিক শব্দ। যেমন- চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, জমিদার, জমিদারি, তালুকদার, তালুকদারি, জোদ্দার, হাওলাদার, ভূঁইঞা, ভৌমিক ইত্যাদি।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত শব্দটির জন্ম হয়েছে ইংরেজি permanent settlement প্রথা থেকে। ফারসি যমিন (ভূমি) + এবং ফারসি বন্ধরূপমূল ‘দার’ মিলে গঠিত প্রথমে যমিনদার পরে জমিদার শব্দটি। জমিদার শব্দ থেকে এসেছেই বিভক্তি যুক্ত জমিদারি শব্দটি। একালে জমিদার না থাকলেও জমিদারি শব্দটি আছে।

এবং প্রয়োগ হচ্ছে। জমিদারি প্রথা স্বল্পসংখ্যক বাঙালির অর্থ আয়ে একটি বিরাট উৎস ছিল। এ প্রথার সাথে সম্পর্কিত শব্দ প্রজা এবং খাজনা ‘খাজনা’ অর্থ ভূমিকার বা রাজস্ব। জমিদারেরা নিয়মিতভাবে প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতেন। ‘খাজনা’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘খিযানা’ থেকে। ভূমি নির্ভর ক্ষুদ্রতর ‘ভূস্বামীগণ’ পরিচিত ছিলেন তালুকলার, হাওলাদার, হালদার, ভূঁইঞা, ভৌমিক ইত্যাদি হিসেবে।

আরবি ‘তাআল্লুক’ এবং ফারসি ‘দার’ দিয়ে গঠিত হয়েছে তালুকদার শব্দটি। হাওলা জমির অর্থ রাজস্বমুক্ত জমি। ১৭৮৭-৮৮ সালে বৃটিশ সরকার কতিপয় যমিনদারকে হাওলাজমি দিয়েছিলেন। হাওলা জমির মালিকগণপরিচিত হয়েছিলেন হাওলাদার বা

হালদার হিসেবে। বাংলাদেশে হাওলাদার এবং হালদার দুটি পদবি দেখা যায়। সমাজভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় দেখা যায় হাওলাদার পদবি ব্যবহার করেন মুসলমানগণ আর হালদার পদবি ব্যবহার করেন হিন্দুগণ। ভূঁইঞা এবং ভৌমিক পদবি সম্পর্কেও প্রায় একই কথা প্রযোজ্য।

ভুইয়া এবং ভৌমিক দুটি শব্দ এসেছে ভূমি থেকে ভূমি থেকে ভূই+আ ভূঁইঞা। অন্যদিকে ভৌমিক শব্দের গঠন ভূমি + ইক ভৌমিক। ভূমি শব্দজাত ভৌমিক পুরোপুরি হিন্দুদের পদবি। অন্যদিকে ভূমি শব্দজাত ভূঁইঞা মুসলামানদের পদবি হলেও হিন্দুরাও মাঝে মাঝে ব্যবহার করে থাকেন।

এখানে বলা উচিত যে ভৌমিক এবং ভূঁইঞা শব্দের মূল উৎস ভূমি। ভূমিক > প্রাকৃত ভূমি অ > ভূঁইঞা, ভূমি + ইক = ভৌমিক (হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৯৬, ২য় খণ্ড; ১৬৮৮ ও ১৭০১) ভূমিকায় চাষাভুষা শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল। লোকটি একটি চাষা। এ বাক্যে চাষা শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে অবজ্ঞার দৃষ্টিকোণ থেকে।

আমি একজন চাষাভুষা মানুষ। এ বাক্যেও নিজেকে চাষাভুষা বলতে অত্যন্ত সাধারণ ব্যক্তি হিসেবে দাবী করা হয়েছে। এ দুটি বাক্য থেকে সহজে বোঝা যায় চাষাবাদকে উন্নত পেশায় মর্যাদা দেয়া হয় না। ট্রাক্টর, বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ ফারটিলাইজার, ইরির সঙ্গে কৃষিবিদদের সমন্বয় ঘটলে বিদেশি ফার্মের অর্থে খামার শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে কৃষি পেশা উন্নতর পেশার মর্যাদা লাভ করতে পারে।

গ. পশুপালনকেন্দ্রিক শব্দ

পশুপালনকেন্দ্রিক শব্দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গরু, গবাদিপশু, বাথান, রাখাল, গোয়ালী, বলদ, গোশালা, গোপ, দুধের গাই, গোধূলি, গোগ্রাম, জাবরকাটা এরকম অসংখ্য শব্দ। এ শব্দগুলোর মধ্যে অনেকগুলো শব্দের ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। রাখাল শব্দ এসেছে রক্ষপাল থেকে।

মূলত গরু চরানোর সঙ্গে এ পেশা সম্পর্কিত ছিল। রাখাল শব্দটি চরাঞ্চলে বহুল ব্যবহৃত। একশ্রেণীর লোক আছেন যারা অন্যের গবাদি পশু লালন পালন করার পেশাকে বাথান প্রথা এবং যারা লালন পালন করেন তাদেরকে বাথানি বা বাঘাইনা (আঞ্চলিক ভাষায়) বলে।

 

বাঙালির অর্থনৈতিক জীবন ও প্রাসঙ্গিক শব্দাবলী

 

ঘ. গ্রামীণ পেশাজীবী ও সমাজভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

শত শত বছর ধরে বাংলার গ্রাম সমাজে রয়েছে সুনির্দিষ্ট পদবিধারী পেশাজীবী। যেমন— কামার, কুমার, জেলে, স্বর্ণকার, চামার, ধোপা, নাপিত, সাহা ইত্যাদি। কামার শব্দটি এসেছে কর্মকার থেকে। লোহার পেশার সঙ্গে অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় দা, কুড়াল, খন্তা, কোদাল তৈরির সঙ্গে যারা জড়িত তারাই কর্মকার বা কামার।

কুমার শব্দটি এসেছে কুম্ভকার শব্দ থেকে। তারা তৈরি করে থাকেন মাটি নির্মিত হাঁড়ি পাতিল থেকে শুরু করে মাটির পুতুল পর্যন্ত অনেক সামগ্রী। স্বর্ণ বণিকগণ সোনার বেনে এবং সোনার নামে পরিচিত। শত শত বছর ধরে তারা স্বর্ণের অলঙ্কার তৈরি করে আসছে।

আজকাল হিন্দু ছাড়া মুসলমানরাও স্বর্ণকার হতে পারে এবং এক্ষেত্রে জুয়েলার্স পরিচিতিতে ভারা বেশি আগ্রহী। জাল ফেলেন যিনি তিনি জেলে। জাল শব্দ। থেকে জেলে শব্দটি সৃষ্টি হলেও জেলে বলতে বহুকাল ধরে বোঝাত গরিব ও অবহেলিত মাছচাষীদের। হিন্দুরাই আগে মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

ফলে জেলে বলতে মাছ ধরার পেশায় নিয়োজিত হিন্দুদের বোঝাত। আজকাল মাছ ধরার পেশার সঙ্গে জড়িত হচেছন প্রচুর ব্যবসায়িক মুসলমান। ফলে বাংলা ভাষায় সংযোজিত হচ্ছে মৎস্যজীবী, মৎস্যচাষ, মৎস্য খামার, হ্যাচারী ইত্যাদি অনেক অনেক শব্দ।

জেলে শব্দটির পদ মর্যাদা না থাকলেও মৎস্য খামার বা ‘মৎস্যজীবী’ শব্দের পদমর্যাদার অভাব নেই। সাহা পদবিধারী ব্যক্তিগণ গ্রামের মিষ্টান্ন তৈরির পেশায় নিয়োজিত। শত শত বছর ধরে জিলেপি, মিষ্টি, রসগোল্লা রসমালাই, মোয়া, মুড়কি ইত্যাদি তৈরি ও বিক্রি করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। ময়ৱা শব্দ রসমালাই, রসকদম্ব, রসগোল্লা এ শব্দগুলো বাংলা বসিক সমাজে দেখা যেত না সাহা শ্রেণীর লোকেরা না থাকলে।

মুচি বা চামার চামড়ার ব্যবসা, ধোপা কাপড় ধোয়ার ব্যবসা এবং নাপিতেরা চুল কাটার পেশার সঙ্গে জড়িত। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে চামার, ধোপা ও নাপিতের পেশা উন্নত পেশা হিসেবে কখনও বিবেচিত হয়নি। নাপিতেরা নাপিত শব্দের বদলে ক্ষৌরকার বা নরসুন্দর ব্যবহারের চেষ্টা

চালালেও মর্যাদার হেরফের হয়নি। ‘তুই একটা চামার’, ‘তোকে আমি ধোপা নাপিত ও রাখি না’ ইত্যাদি গালাগাল বাংলার সমাজে এখনও মাঝে মধ্যে শোনা যায়। পেশা ও পেশাজীবীদের প্রতি অবজ্ঞা পৃথিবীর খুব বেশি দেশে নেই। বিভিন্ন পেশার প্রতি অবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ বাঙালিদের দারিদ্রের জন্যে অনেকটা দায়ী।

ঙ. পেশা ও ব্যবসা বাণিজ্যকেন্দ্রিক শব্দ ও প্রতিশব্দ

ব্যবসা বাণিজ্যকেন্দ্রিক শব্দ এবং কিছু প্রতিশব্দের ভাষাতাত্ত্বিক গঠন নিচে বিশ্লেষিত
হল: যুদ্ধার

(১) সওদাগর
সওদাগর দুটি ফারসি রূপমূল ফারসি সওদাগরের ‘সও’ এর উচ্চারণ বাংলায় ‘শ’- তে পরিণতি হয়েছে। বর্তমানে সওদাগরের অর্থ দাঁড়িয়েছে ব্যবসায়ী।

(২) আমদানি-রপ্তানি
ফারসি আমদ ও রফত এর আক্ষরিক অর্থ আসা-যাওয়া। আমদ, রত থেকে গঠিত হয়েছে আমদানি রফতানি। যার ইংরেজি প্রতিশব্দ Export Import

(৩) সুদখোর
ফারসি মুক্তরূপমূল সুদ এবং ফারসি বদ্ধরূপমূল ঘোর মিলে হয়েছে সুদখোর (শুদখোর) শব্দটি। এখানে ফারসি ‘স’ বাংলা ‘শ’-তে পরিণত হয়েছে (শ) ।

(৪) নৌকার প্রতিশব্দ।
নৌকা, সাম্পান, বালাম, পানসি, গনা, ডিঙি, ঘাসি, গোদারা ইত্যাদি। প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক পরিবেশানুসারে অধিকাংশ প্রতিশব্দ তৈরি হয়েছে। সাম্পান মূলত ব্যবসার নৌকা হিসেবে ব্যবহৃত ।

৫) নৌকা বা জাহাজের সাথে সম্পর্কিত শব্দ

সারেং, সুকানী, মাঝি, নাইয়ে, পাল, হাল, মাস্তুল, ধার, গলুই, খোল ইত্যাদি। সুকানী শব্দের গঠন নিম্নরূপ আরবি সুককান+ই= সুকানী, সুকরান শব্দের অর্থ হাল। বর্তমানে বড় জাহাজে যিনি হাল ধরেন তিনি সুকানী নামে পরিচিত। প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে দিশেহারা সুকানীরা মাঝে মাঝে হাল ছেড়ে দেন। এই প্রক্রিয়ার অনুসরণে শুকনো ডাঙ্গাতেও কোনো সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়ে আমরা অনেক সময় হাল ছেড়ে দেই।
৬।জোদ্দার

জি এম হিলালী’র মতে সংস্কৃত Yotra থেকে জোন শব্দটি এসেছে। এই ঘোর এর সঙ্গে ফারসি বদ্ধরূপমূল ‘দার’ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে জোদ্দার। য়োঐ জোৎ- +
দার = জোদ্দার

(৭) পেশকার
পেশকার। বাংলা অর্থ দাঁড়িয়েছে বিচারালয়ে মামলা উপস্থাপনকারী। ফারসি শব্দের মূল অর্থ কেরানি, সহকারি ইত্যাদি।

(৮) নকলনবিশ
নবিশ এর অর্থ যে লিখে। নকলনবিশ অর্থ যিনি অফিসের কাগজপত্র নকল বা কপি করেন। বর্তমানে ফটোকপি মেশিনের ব্যাপক ব্যবহারের জন্য এরূপ পেশা উঠে যাবার উপক্রম। এক সময় হয়তো শব্দটিও উঠে যাবে। এছাড়াও বাংলায় ‘নবিশ’ শব্দটি আনকোরা, নতুন, প্রভৃতি অর্থে ব্যবহৃত হয়।

(৯) বদমাশ
বদমাশ শব্দটির গঠন চমকপ্রদ। ফারসি ‘বদ’ আরবি ‘মাশ’ দিয়ে গঠিত হয়েছে। বদমাশ শব্দটি। মাশ শব্দের অর্থ জীবিকা। সুতরাং বদমাশ এর অর্থ খারাপ জীবিকারলোক। খারাপ জীবিকার লোকদের পক্ষে যেহেতু খারাপ চরিত্রের হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেহেতু বদমাশ অর্থ বর্তমানে দাঁড়িয়েছে দুশ্চরিত্র। (পূর্বোক্ত জি এম হিলালী; ১৮৬ – ১৮৭)।
(১০) টাকাকড়ি
টাকা+কড়ি= টাকাকড়ি অত্যন্ত সহজ গঠন। কড়ি রূপমূল এলো কোত্থেকে? এ প্রশ্ন উঠতে পারে। এক সময় সামুদ্রিক কড়ি (টাকার মত) লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো। আমার কাছে এক কানাকড়িও নেই। এখনও এই বাক্যটি ব্যবহৃত হতে শোনা। যায়। আবার আমি একেবারে কপর্দকশূন্য একথাও শোনা যায়। কোনো কোনো পণ্ডিতদের মতে কপর্দক থেকে কড়ি শব্দটি এসেছে।

সং কপর্দিকা > প্ৰা কড়ী/ করডী> বাংলায় কড়ি। সংস্কৃতের আদ্য ব্যঞ্জন ক-বৰ্ণ অপরিবর্তিত। অঘোষ বর্ণ হয়েছে? ঘোষবর্ণ ব-ধ্বনি। সুতরাং ঘোষীভবন হয়েছে। দন্ত্য ব্যঞ্জন দ-বর্ণ মূর্ধা ও বা ড্র-তে পরিণত- মূর্ধন্য ভবনের দৃষ্টান্ত।

মধ্যব্যঞ্জন র বা ক বিলুপ্ত এবং অন্ত্যব্যঞ্জন ও লুপ্ত হওয়ার কারণে আকর্ণ দীর্ঘ-ঈ বর্ণে পরিণত। বাংলায় আদ্য ব্যঞ্জন অটুট থাকলেও মধ্যব্যঞ্জন ব-লুপ্ত হয়েছে বলে, একে মধ্য স্বরলোপের (Syncope) উদাহরণ বলতে হয়। শব্দটি সংকোচনেও দেখা গিয়েছে। (পূর্বোক্ত, অরুণকুমার ঘোষ, ১৪৮)।

(১১) গঞ্জ
নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শম্ভুগঞ্জ শব্দভুক্ত গঞ্জের অর্থ নদীবন্দর। শব্দটি আসছে ফারসি ‘গঞ্জ’ থেকে। আক্ষরিক অর্থ আড়ত, শস্যবাজার ইত্যাদি। যেহেতু আড়ত শস্যবাজার সাধারণত নদীতীরে গড়ে উঠে সেহেতু গঞ্জ বলতে বাংলায় নদী বন্দরকে বোঝায়।

ইংরেজ আমলে অর্থ উপার্জনকেন্দ্রিক প্রচুর ইংরেজি শব্দ বাংলায় সংযোজিত হয়েছে। যেমন- অফিস, ক্লার্ক, ম্যানেজার, সেকশন অফিসার, আরনালি, ডিরেক্টর, এ্যাসিসটেন্ট ডিরেক্টর, এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, হেডমাস্টার, প্রিন্সিপাল,

ভাইস-প্রিন্সিপাল, ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, সার ডিপুটি সাব রেজিস্টার, জয়েন্ট সেক্রেটারি, সেক্রেটারি ইত্যাদি অসংখ্য শব্দ। এ শব্দগুলোর মধ্যে কয়েকটি শব্দের গঠন এখানে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যেমন-

(১২) হেড পণ্ডিত
ইংরেজি হেড এবং পণ্ডিত মিলে গঠিত হয়েছে হেডপণ্ডিত। পণ্ডিত শব্দটি এখন ইংরেজি শব্দের তালিকাভুক্ত।

(১৩) হেডমৌলভী
‘হেড মৌলভী’ শব্দের ‘হেড’ ইংরেজি ‘মৌলভী’ ফারসি। প্রচলিত ভাষাতাত্ত্বিক পরিভাষায় এগুলি সংকর শব্দ (Hybrid) হিসেবে পরিচিত। সমাজভাষাতাত্ত্বিক পরিভাষায় এগুলো বিশেষ ধরনের Code switching

(১৪) বাঈজি
সম্ভ্রান্ত মহিলা নামের শেষে বাঈ সম্মানসূচক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হতো মহারাষ্ট্র, গুজরাট, রাজপুতেনা প্রভৃতি অঞ্চলে। যেমন- হিন্দিতে সেন বাঈ, মিসেস বাঈ ইত্যাদি বলে মহিলাদের সম্মান দেখানো হতো। এর সাথে ‘জি’ যোগ করে অধিকতর সম্মান দেখানো হতো।

কিন্তু বাংলায় এসে শব্দটির অর্থ পরিবর্তন হয়ে গেছে। বর্তমানে ‘বাইজি’ বলতে আমরা পেশাদার গায়িকা, নর্তকী বুঝে থাকি। সহকারী বৃন্দ সম্মানের সঙ্গে বলতেন গহরজান বাইজি ‘আ রাহা হেঁ। যেহেতু গহরজান একজন নর্তকী ছিল, ফলে বাঙালি শ্রোতারা ভাবতো বাইজি মানে নর্তকী।

পরবর্তীকালে নাচনেওয়ালী, মুজরাওয়ালী নর্তকীরা মাঝে মাঝে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে দেহ ব্যবসায় লিপ্ত হতো বলে বাঈজি বলতে বাংলায় দেহ ব্যবসায় নারীদের বোঝানো হত। বাঈজী বাঈজী ।

 

বাঙালির অর্থনৈতিক জীবন ও প্রাসঙ্গিক শব্দাবলী

 

(১৫) আমলা ও আমলাতন্ত্র

বাংলাদেশে সচিব, সচিবালয় ইত্যাদি শব্দ বহুল ব্যবহৃত। কিন্তু ব্যুরোক্রেট এবং বুরুক্রেসি অর্থ আমলা এবং আমলাতন্ত্র, আমলা, আমলাতন্ত্র, বড় আমলা, ছোট আমলা ইত্যাদি শব্দ প্রায়ই ব্যবহৃত হতে শোনা যায়। আরবি বহুবচন আমালা থেকে গঠিত হয়েছে আমলা শব্দটি। মূল অর্থ অফিসার বা সরকারি অফিসার।

পৃথিবীর আদিমতম পেশার সঙ্গে সম্পর্কিত বাঈজী শব্দ এবং ক্ষমতায় সঙ্গে সম্পর্কিত আমলা ও আমলাতন্ত্রের ভাষাতাত্ত্বিক গঠন বিশ্লেষণ করে আপাতত এই অধ্যায়ের ইতি টানা হলো।
বাংলাদেশের মানুষের কৃষিকেন্দ্রিক অর্থ উপার্জনের ইতিহাস থেকে শুরু করে ব্যবসা বাণিজ্য ও চাকুরী নির্ভর উপার্জন প্রক্রিয়া ও পদবির কারণে সৃষ্ট হয়েছে অনেক শব্দ।

আরদালি শব্দের মূলে যে ইংরেজি অর্ডালি শব্দটি আছে এ কথা অনেকেই ভুলে গেছেন। অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন ইংরেজি অফিস এবং আর মিলে গঠিত হয়েছে অফিসার শব্দটি। অফিসার, ম্যানেজার, ডিরেক্টরের মতো অনেক শব্দকেই ভবিষ্যতে মনে হবে বাংলার নিজস্ব শব্দ। যেমন- ‘সবুজ’ যে ফার্সী শব্দ তা আমাদের আজ মনেই হয় না।

আরও দেখুন:

 

Leave a Comment