সমাজ ও পরিবারকেন্দ্রিক শব্দ

আজকে আমাদের আলোচনার  বিষয় -সমাজ ও পরিবারকেন্দ্রিক শব্দ

সমাজ ও পরিবারকেন্দ্রিক শব্দ

ক. ভূমিকা

বাংলাদেশের পরিবার ও সমাজকাঠামো অনেকটা এরকম- সাধারণত স্বামী স্ত্রী ছেলেমেয়ে নিয়ে গঠিত হয় একটি পরিবার। কয়েকটি পরিবার নিয়ে একটি বাড়ি। কয়েকটি বাড়ি নিয়ে একটি পাড়া, কয়েকটি পাড়া নিয়ে একটি গ্রাম এবং এক বা একাধিক গ্রাম নিয়ে একটি ইউনিয়ন।

একটি থানা বা উপজেলার সমাজ সংস্কৃতি প্রায় একই রকম। অন্যদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন উপজেলা, জেলা এবং বিভাগের সমাজ- সংস্কৃতির বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে একটি উপজেলার সংস্কৃতি থেকে অন্য উপজেলার সংস্কৃতি খুব বেশি আলাদা নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের একটি গ্রামে বা একটি শহরে যে সামাজিক কাঠামো সমাজ বিবর্তন লক্ষ করা যায় বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রাম ও শহরের সেই কাঠামোর ভিন্নতা খুব একটা লক্ষ করা যায় না।

বাংলাদেশ এখনও কৃষিপ্রধান দেশ। এখানো দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। ফলে তাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনকেন্দ্রিক শব্দ বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে প্রভাবিত করেছে। পরবর্তীকালে নগরকেন্দ্রিক জীবনসভ্যতা এবং উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণী সৃষ্টির কারণে শব্দভাণ্ডারে স্বাভাবিক পরিবর্তন আসছে, এমনকি গ্রামীণ কিছু কিছু শব্দ সভ্যতার পরিবর্তনের কারণে বিলুপ্ত হতে চলেছে।

বাংলার গ্রাম ও নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা এবং সমাজ পরিবেশের কারণে সৃষ্ট কতিপয় শব্দ নিচে বর্ণিত ও বিশ্লেষিত হলো।

সমাজ ও পরিবারকেন্দ্রিক শব্দ

 

খ. শব্দের গঠন বর্ণনা ও বিশ্লেষণ

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পিতার কর্তৃত্বকেন্দ্রিক এবং কোনো কোনো দেশে মাতার কর্তৃত্বকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থা রয়েছে। এর ফলে ইংরেজিতে সৃষ্ট হয়েছে যথাক্রমে

Patriarchal এবং Matriarchal এ দুটি শব্দ। ধারণা করা হয় এরই প্রভাবে বাংলায় তৈরি হয়েছে যথাক্রমে পিতৃতান্ত্রিক (পিতৃ+তন্ত্র+ইক) এবং মাতৃতান্ত্রিক (মাতৃ+তন্ত্র+ইক) শব্দ দুটি। বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবার পিতৃতান্ত্রিক পরিবার। দুই একটি উপজাতির মধ্যে মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে কিছু বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। যেমন গারো সমাজ।

বাংলাদেশের সাধারণ একটি পরিবার স্বামী স্ত্রী ছেলেমেয়ে নিয়ে গঠিত হলেও এখনো গ্রামের অনেক পরিবার স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর মা বাবা ভাইবোনকে একই সঙ্গে বসবাস করতে দেখা যায়। এ ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট হয়েছে একান্নবর্তী পরিবার। এ শব্দের গঠন নিম্নরূপঃ

এক+অম্ল+বর্তী+পরিবার। অর্থাৎ তারা এক ঘরে রান্না করা খাবার খায়। একান্তবর্তী পরিবার ভেঙ্গে গেলে গ্রামে এখনও ব্যবহৃত হয় ‘জুদা’ শব্দটি। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে ব্যবহৃত হয় হুদা শব্দটি অর্থাৎ অমুক পরিবার জুদা (অর্থাৎ পৃথক হয়ে যাওয়া) হয়ে গেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে “আলাদা হয়ে গেছে”, “ভিন্ন হয়ে গেছে” এ ধরনের শব্দ শোনা যায়।

বাংলাদেশের পারিবারিক কাঠামোর কারণে সৃষ্ট হয়েছে অনেকগুলো স্বল্পনসূচক শব্দ (Kinship terms)। যেমন- পিতা-মাতা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, মামা-মামি, পিসি-পিসা, মাসি মেসু ইত্যাদি অনেক শব্দ। এ শব্দগুলোর সঙ্গে তো- তুতো যুক্ত হয়ে সৃষ্ট হয়েছে আরো অনেক শব্দ। যেমন- খালাতো, মামাতো, চাচাতো, পিসতুতো, মাসতুতো ইত্যাদি। অন্যদিকে সামাজিক স্তর বিন্যাসের কারণে বিভিন্ন শব্দ গঠনে এসেছে অনেক বৈচিত্র্য।

বাংলার শহর ও গ্রামঞ্চলে প্রায় প্রত্যেক পাড়া ও সমজে রয়েছে প্রধানত দুটি ধর্মকেন্দ্রিক জনগণের অস্তিত্ব। দুটি জনগোষ্ঠী, হিন্দু ও মুসলমানের অস্তিত্ব। এর ফলে সৃষ্ট হয়েছ কতিপয় স্বজনসূচক জোড়া শব্দ। যেমন-

ধারণা

জনক

জননী

বাবার বোন

মায়ের বোন

ভাইয়ের স্ত্রী

বোনের স্বামী

মুসলিম ব্যবহৃত শব্দ

আব্বা / বাধা

আম্মা / মা

ফুফু

খালা

ভাবি

দুলাভাই

হিন্দু ব্যবহৃত শব্দ

বাবা

মা

পিসি

মাসি

বৌদি

জামাইবাবু

এ তালিকা সুদীর্ঘ না করে আরো কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রথমত ইংরেজির প্রভাবে জনক সম্বোধনের ক্ষেত্রে ড্যাডি, মাম্মি, মা, জননী ইত্যাদি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। ফরাসি ‘ফিয়াসে’ শব্দটিও ইংরেজি ভাষা হয়ে বাংলায় প্রেমিকা অর্থে উচ্চবিত্ত সমাজে ব্যবহার হতে দেখা যাচ্ছে সম্প্রতি।

অন্যদিকে সম্মান প্রদর্শনের জন্যে সম্বোধনকালে সম্বোধনসূচক জ্ঞান, জি, মশাই, দেব, বাবু, মনি ইত্যাদি নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- আব্বাজি, আব্বাজান, মামনি, পিতৃদেব, পিসে মশাই, জামাই বাবু ইত্যাদি। পিতৃদের শব্দ থেকে বোঝা যায় পিতাকে এক সময় দেবতার মতো মনে করা হতো। এসব শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক গঠন খুব কঠিন নয়। বৌদি শব্দটির গঠন নিম্নরূপঃ

বউ+দিদি। দিদি শব্দের শেষ দি বাদ দিয়ে (deleted) বৌদি শব্দটি গঠিত হয়েছে। এ শব্দের সহজ সামাজিক সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা এরকম। ভাইয়ের বউকে দেবর অথবা ননদেরা বড় বোন হিসেবে দেখছে। প্রসঙ্গত ‘বউ মা’ শব্দটির কথাও

আসতে পারে। বউ এবং মা দুটি মুক্তরূপমূল দিয়ে গঠিত বউমা শব্দটির মূলে আছে ছেলের বৌকে কন্যা হিসেবে মর্যাদা দেয়ার বিষয়টি। ‘তো’ এবং ‘তুতো’ আসলে একই রূপমূলের সহরূপমূল। স্বরান্ত শব্দের শেষে “তো” এবং ব্যঞ্জনাত্মক শব্দের শেষে সাধারণত “ভুতো’ বসে থাকে। যেমন- খালাতো, মাসতুতো, তালতো ইত্যাদি।

পিসি শব্দের ‘ই’ morphophonemic change এর কারণে deleted হয়ে ‘পিস’ হয়েছে। তার সঙ্গে তুতো যুক্ত হয়ে হয়েছে পিসতুতো। গবেষকদের মতে তো, ভূতো, Suffix সামাজিক নৈকট্যের ইঙ্গিতবাহী (রাজীব হুমায়ুন, ২০০১:৩৮ )

প্রসঙ্গত ইংরেজি mother in law এর সঙ্গে বাংলার শত্রু মাতা অর্থাৎ শ্বাশুড়ি শব্দের তুলনা করা যেতে পারে। ইংরেজিতে স্বামী বা স্ত্রীর মা আইনের ফলে সৃষ্ট মা বাংলায় এটিকে আইনের ফলে সৃষ্ট মা ভাবা হয় না, আপন মা হিসেবে ভাবা হয়। সম্বোধনেও তার প্রতিফলন রয়েছে। বাংলার প্রায় প্রত্যেক বর বধূ তাদের শতর
শ্বাশুড়িকে মা-বাবা / আব্বা আম্মা হিসেবে সম্বোধন করে থাকে।

স্বজনসূচক শব্দাবলীর বিশ্লেষণ করলে সামাজিক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু সীমাবদ্ধতাও চোখে পড়বে। Husband শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে বাংলায় আছে স্বামী, বর, কর্তা, পতি, গৃহকর্তা ইত্যাদি। অন্যদিকে স্ত্রী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে রয়েছে স্ত্রী, পত্নী, গৃহিনী, গিল্লী, অধাঙ্গিনী, রমনী, গৃহকর্তী, শয্যাসঙ্গিনী, জীবনসঙ্গিনী ইত্যাদি।

অধিকাংশ মহিলা স্বামীর নাম না ধরে ওগো শুনছ, রহিমের আব্বা, পতিদের, পতিপরমেশ্বর ব্যবহার করে থাকেন। সর্বনাম এবং সম্মানসূচক রূপমূল ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বামী প্রসঙ্গে কোনো কোনো স্ত্রী আপনি এবং সঙ্গতিসূচক সহরূপমূল বা বদ্ধরূপমূল ন এ ব্যবহার করে থাকেন। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে Husband বোঝাতে স্বয়ং স্বামী শব্দটির প্রয়োগ সঠিক নয়। স্বামী মানে মাস্টার

 

সমাজ ও পরিবারকেন্দ্রিক শব্দ

 

অথবা প্রভু। স্বামীর অর্থ যেহেতু মাস্টার অথবা প্রভু সেহেতু আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্বামী শব্দের ব্যবহার সঙ্গত নয়। কর্তা শব্দের অর্থ ‘যে করে হলেও কর্তা শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রভু অথবা ‘হেড’ এর ব্যঞ্জনা। ভবিষ্যতে হয়তো স্বামীর বদলে ব্যবহৃত হবে জীবনসাথী বা জীবনসঙ্গী জাতীয় কোনো শব্দ।

এবারে ইংরেজিঙ্গ Wife এর কিছু বাংলা প্রতিশব্দ বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। অর্ধাঙ্গিনী, গৃহিনী, গিন্নী অনেকটা সম্মানসূচক। অধাঙ্গিনী হয়তোবা ইংরেজি better half এর আদলে সৃষ্ট। কিন্তু শয্যাসঙ্গিনী এবং রমনী শব্দ বিশ্লেষণ করলে শুধুমাত্র Sex partner এর ইঙ্গিত আসে।

এ কারণে এ দুটি শব্দের ব্যবহার সচেতন লেখকের শব্দভাণ্ডার থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। গৃহিনী বা গিন্নী শব্দটি ব্যঞ্জনা খারাপ না হলেও এ দুটি শব্দ বা এ শব্দ মেয়েদের ঘরে থাকা তথা House wife এর ইঙ্গিত দেয়। সংগত কারণেই সচেতন, শিক্ষিত চাকুরীজীবী মহিলারা বর্তমানে এধরনের শব্দ ব্যবহারে কখনো কখনো আপত্তিও করেন।

পরিবারের গণ্ডির বাইরে রাজা, প্রজা, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, ত্র, বৈশ্য, আশরাফ, আতরাফ, কুলীন, অভিজাত, অনভিজাত, খানদান, খানদানি, শরীফ, ক্রীতদাস, ক্রীতদাসী ইত্যাদি শব্দের অস্তিত্ব বাংলা ভাষায় বহুকাল ধরে প্রচলিত রয়েছে। প্রত্যেকটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে সামাজিক স্তরবিন্যাস।

রক্ত, বর্ণ, বংশ, আভিজাত্য, অর্থ, রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত এসব শব্দাবলী । এখনও রাজা প্রজা না থাকলেও মন্ত্রী, উপমন্ত্রী রয়েছে। আরো রয়েছে প্রতাপশালী নেতা। রয়েছে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অমুক খুব বড় পোস্টে আছেন, অমুক অনেক টাকা মাইনে পান।

এসব শব্দের পেছনে রয়েছে নগরকেন্দ্রিক চাকুরীজীবী এবং
রাজনৈতিক ক্ষমতাশালীদের ইতিবৃত্ত। পদবিরও পরিবর্তন ঘটেছে কিছুটা। শেখ, সৈয়দ, খান, চ্যাটার্জি, ব্যানার্জিরদের চাইতে এখন ফজলুল হক বি.এ, আবুল কাশেম

এম.এ., ডক্টর উদয়নারায়ণ ব্যরিস্টার মুনিরুজ্জামান, প্রফেসর মোরশেদ এগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি। তাছাড়া বিলাত ফেরত, দুবাইওয়ালা, লন্ডনী, সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে ইত্যাদি শব্দ যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে।
উপরের আলোচনায় নারী সম্পর্কিত কিছু শব্দ বিশ্লেষিত হয়েছে। এরকম আরো কয়েকটি শব্দ ও প্রাসঙ্গিক সমাজভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দেয়া হলোঃ

(১) অবলা
ভাষাতাত্ত্বিক গঠনঃ অ+বল+আ। অর্থাৎ নেই বল যার+স্ত্রী প্রতায় ‘আ’ = যে নারীর বল নেই। এ গঠনটি অত্যন্ত সহজ এবং সর্বজনবোধ্য। এ শব্দের সমাজতাত্ত্বিক। বিশ্লেষণও খুব একটা কঠিন নয়। ‘অবলা’ শব্দ থেকে বোঝা যাচ্ছে নারীদের একসময় দুর্বল এবং অসহায় ভাবা হতো।

(২) অন্তঃপুরিকা
ভাষাতাত্ত্বিক গঠনঃ অন্তঃ+পুর+ইকা। অর্থাৎ ভেতর বাস করে স্ত্রী প্রতায় ‘আ’। সমাজ ও সংস্কৃতি দৃষ্টিকোণ থেকে সহজে বোঝা যাচ্ছে এক সময় নারীদের স্থান ছিল
অন্তঃপুরে।

(৩) অবরোধবাসিনী
শব্দের গঠনঃ অব+রোধ+বাস+ইনী। বেগম রোকেয়ার গ্রন্থের শিরোনামে ব্যবহৃত এ শব্দ ইঙ্গিত দেয় নারীদের অবরুদ্ধ জীবনের কথা ।

(৪) কুমারী ও অক্ষতযোনি
ইংরেজী Virgin শব্দের প্রতিশব্দ হিসাবে ব্যবহৃত হয় কুমারী ও অক্ষতযোনি শব্দ দুটি। দুটি শব্দের মধ্যেই প্রাগবৈবাহিক জীবনে পুরুষের সাথে দৈহিক মিলন হয়নি

এরকম ইঙ্গিতবাহী। কুমারী শব্দটি অসুন্দর না হলেও অক্ষতযোনি শব্দটি অবশ্যই অসুন্দর এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণে সামাজিক এবং আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে অক্ষতযোনি শব্দটি অভিধান থেকে নিবসিত হওয়া প্রয়োজন। অবশ্য একথাও স্বীকার্য এ শব্দটির ব্যবহার নেই বললেই চলে। প্রসঙ্গত নারীসম্ভোগ শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে আছে পুরুষের একপেশে নারীদেহ ভোগের ইঙ্গিত। যেহেতু পুরুষশাসিত সমাজ, তাই পুরুষসম্ভোগ শব্দ সৃষ্টি হয়নি।

(৫) পুরুষ প্রসঙ্গে ইতিবাচক-নেতিবাচক (Positive negative) দৃষ্টিকোণ থেকে বেশকিছু শব্দ রয়েছে। যেমন- সুপুরুষ, কাপুরুষ, নপুংশক, নামরদ, ণৈ, পৌরুষ, পুরুষত্বহীনতা ইত্যাদি। এ শব্দগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে দৈহিক সক্ষমতা, অক্ষমতা এবং শৌর্যবীর্যের প্রসঙ্গ।

(৬) পুরুষ সমাজ প্রভাবিত নারীকেন্দ্রিক কিছু প্রতিশব্দের উল্লেখ করা যেতে পারে। সুকেশা, দুদন্তী, সুহাসিনী, সুনয়না, নিতম্বিনী, পদ্মিনী, হস্তীনি, যৌনাবেদনময়ী (Sexi ), ছলনাময়ী ইত্যাদি শব্দ নিঃসন্দেহে পুরুষের নারীদেহের প্রতি আকর্ষণজাত

 

সমাজ ও পরিবারকেন্দ্রিক শব্দ

 

গ. ঘর-বাড়ি ও প্রাসঙ্গিক শব্দাবলী

একদিকে গ্রামীণ সভ্যতা ও নগর সভ্যতা অন্যদিকে কৃষি সভ্যতা থেকে ব্যবসা ও চাকুরী নির্ভর সভ্যতার কারণে বাংলা শব্দভাণ্ডারে প্রচুর বৈচিত্র্য এসেছে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ইত্যাদি শ্রেণী সৃষ্টির কারণেও শব্দভাণ্ডারে সংযোজন-বিয়োজন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে।

(১) গ্রামীণ পরিবার কেন্দ্রিক শব্দ

মূলত কৃষিনির্ভর গ্রামীণ পরিবারে ঘর, উঠান, বাগ-বাগিচা, পুকুর, কাচারি, লাঙল, জোয়াল, গোয়াল ঘর, জমি, চাষাবাদ, ফসল, ভাত, চাষী, আউশ, আমন, বোরো,

ইরি, গোবর, সার, ইত্যকার অসংখ্য শব্দ রয়েছে। গৃহকেন্দ্রিক শব্দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ছনের ঘর, মাঠির ঘর, টিনের ঘর। তাছাড়া আছে পাকের ঘর / রান্না ঘর / রসই ঘর, ঢেঁকি ঘর ইত্যাদি। ছনের ঘর এবং টিনের ঘরসমূহ হতে পারে আটচালা, ছয়চালা, চৌচালা, তেচালা, দুচালা, একচালা মাটির ঘর থেকে শুরু করে একচালা পর্যন্ত সকল শব্দের পেছনে রয়েছে ঘরের মালিকের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিচয়।

আটচালা শব্দটি গঠিত হয়েছে আট+চাল+আ দিয়ে। টিন আবিষ্কৃত না হলে এবং অর্থবিত্ত না থাকলে আটচালা টিনের ঘরের জন্ম হতো না। একসময় গোলাভরা ধানের কথা এবং গোয়াল ভরা গরুর কথা আমরা শুনেছি। গোলাজারা ধানের জন্যে কৃষিনির্ভর গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারে ছিল গোলাঘর। বড়চাষী অথবা জমিদার শ্রেণীর অস্তিত্ব গ্রাম থেকে কমে যাচ্ছে বলে গোলাঘর শব্দটি আজ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

এক সময় গ্রামীণ সম্পন্ন পরিবারে অতিপ্রয়োজনীয় ঘর ছিল কাচারি ও আতুর ঘর। হিন্দু গর্ভবর্তী মহিলার জন্যে অবশ্যই আতুর ঘর থাকত। সন্তান জন্মের সময় কিংবা সন্তান জন্মের পর তাকে আতুর ঘরে কাটাতে হতো।

(২) নাগরিক ও আধুনিক সভ্যতা কেন্দ্রিক শব্দ

গ্রামের কিছু কিছু পরিবারের এবং শহরের বহু পরিবারে ঘরের কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে গেলে অর্থনেতিক-সামাজিক কারণে ভাষার ভাণ্ডারে যোগ হল অনেক নতুন শব্দ। অট্টালিকা, প্রাসাদ, পাকা দালাল, ফ্ল্যাট, এপার্টমেন্ট, মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং, হাইরাইজ বিল্ডিং, একতলা, দোতলা থেকে শুরু করে নয়তলা, দশতলা, চব্বিশতলা, পঁচিশতলা পর্যন্ত শব্দাবলী এবং সঙ্গে সঙ্গে সংযোজিত বলো ইংরেজি ফাষ্ট ফ্লোর, সেকেন্ড ফ্লোর, নাইনথ ফ্লোর, টেনথ ফ্লোর, লিফট, আকাশচুম্বী ইত্যাদি শব্দ ।

বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢুকলে বাংলা বা আরবি ফারসি শব্দের সন্ধান পাওয়া মুশকিল হবে। সেখানে পাওয়া যাবে মাস্টার বেডরুম, টয়লেট, কিচেন, সার্ভেন্ট রুম, ব্যালকনি প্রভৃতি শব্দ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাথটাব। আরো ধনীদের বাড়িতে

পুকুরের সম্ভাবনা দেখা দিলেও সুইমিং পুল এসে পুকুরকে বিতাড়িত করেছে অনেক আগেই। বাড়ির আর্কিটেকচারাল প্ল্যান থেকে শুরু করে স্ট্রাকচারাল ডিজাইন পর্যন্ত সর্বত্রই ইংরেজি এবং ইংরেজি শব্দ। ইংরেজি শব্দের পেছনে ভাষাতাত্ত্বিক পরিভাষা Code switching এর কথা তোলা যেতে পারে।

কিন্তু তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পাশ্চাত্য স্থাপত্যকলা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভাব। এ সকল শব্দের অনেকগুলিই সরাসরি বিদেশাগত শব্দ, কিছু রয়েছে অনুবাদ ঋণ। আমাদের স্থপতি ও প্রকৌশলীগণ বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে ঘর বাড়ি তথা বহুতলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করলে হয়তোবা বাংলা শব্দ স্থান পেতে পারতো।

(৩) তৈজসপত্র

এবারে ঘরের তৈজসপত্র / আসবাবপত্র এবং প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় তালিকার দিকে চোখ বোলানো যেতে পারে। গ্রামের মাটির সানকিকে বহু আগেই বিতারিত করেছে অভঙ্গুর টিনের থালাবাসন এবং হালের মেলামাইন। আর মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের ঘরে বহু আগেই প্রবেশ করেছে চীনা মাটির প্লেট, স্টিলের দামি প্লেট এবং উন্নতমানের ক্রোকারিজ। ‘বাটাভরা পান দেব’ এর বদলে এখন হয়তো ব্যবহৃত হতে পারে ‘ট্রেভরা চা দেব’।

আরো ধনীদের ঘরে (বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে) প্রবেশ করলে দেখা যাবে রাইস কুকার, প্রেসার কুকার সেন্ডউইচ মেকার, ব্লেন্ডার, ওভেন ইত্যাদি। ঢেঁকির মৃত্যু প্রসঙ্গে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল আগে। সমাজ সভ্যতা এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এবং আরো অনেক তৈজসপত্র এবং রান্না ও খাওয়া-দাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দের অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু ঘটবে। Sound change এর সঙ্গে সংযোজিত হবে Word change অথবা Code change জাতীয় পরিভাষা।

ঘ. খাদ্য ও প্রাসঙ্গিক শব্দ

‘আমরা সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ দেবীর কাছে এ প্রার্থনা জানিয়ে ছিলেন মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্ৰ মাছ-ভাত, ডাল-ভাত, শাব-ভাতের কথা অনেক লেখক-

লেখিকা এবং নেতানেত্রীর মুখে প্রায়শই শোনা যায়। বাঙালি খাদ্য তালিকায় গোত মাংস সংযোজিত হয়েছে কবে সঠিক বলা মুশকিল। তবে মুগলাই, কাবাব, বিরিয়ানী, পোলাও, কোরমা ইত্যাদি সম্ভবত সংযোজিত হয়েছে মোগল আমলে অথবা নবাবি আমলে।

বিশ শতকে এসে ইংরেজ আমলে হয়তোবা বাংলা শব্দভাণ্ডারের আশে- পাশে উকি ঝুঁকি মারছিল- বিফ বারগার, হেম বারগার, পিৎজা, স্যান্ডউইচ, ব্রান্ডি, হুইস্কি, বিয়ার ইত্যাদি। বর্তমানে মোগল নেই, নবাব নেই, ইংরেজ নেই এমন কি কোনো বিদেশি প্রভুও নেই। কিন্তু বাংলা শব্দভাণ্ডার ভরে যাচ্ছে বিদেশি খাদ্যভাণ্ডার প্রভাবিত শব্দাবলীতে।

পাতা, ভর্তা, পাকন পিঠা, পাটিসাপটা, চিতই পিঠা এখনও হয়তো গ্রামে বেঁচে আছে। শহরের ফাস্টফুডের দোকানে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে এমনকি উচ্চবিত্তের প্রাত্যহিক ‘ডাইনিং টেবিলে চলে আসছে চিকেন কর্ন স্যুপ, থাই স্যূপ, ফ্রাইড রাইস, চিকেন ফ্রাইড রাইস, এগফ্রাইড রাইস, ফ্রাইড চিকেন, গ্রিল্ড চিকেন পিজা, সাসলিক ইত্যাদি অসংখ্য খাদ্যকেন্দ্রিক শব্দ। আজকালকার টিন এজারদের ফাস্টফুড ছাড়া রুচি হয় না।

বিদেশের সঙ্গে জয়েন্ট কলেবরেশনে তৈরি ম্যাগডোনাল্ড জাতীয় ফাস্টফুডের দোকান ছাড়া তাদের বিকেল কাটতে চায় না। ফাস্টফুডকেন্দ্রিক অধিকাংশ শব্দই পাশ্চাত্য প্রভাবিত। ফলে নববর্ষের সকালে অথবা “এখানে বাঙালি খাবার পাওয়া যায়’ সাইনবোর্ড সম্বলিত দু একটি দোকানে হয়তোবা খুঁজে বের করতে হবে পাতা, পদ্মার ইলিশ এবং এ জাতীয় কিছু বাংলা খাবার। প্রসঙ্গত হুঁকো, আলবোলা, হুঁকোবন্দ ইত্যাদি শব্দের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

বিড়ি সিগারেট, প্রায় বিতাড়িত করে চলেছে হুঁকা/ হুক্কা, ডাবা / হোকো ইত্যাদিকে। জমিদারদের সুদৃশ্য আলবোলা যাদুঘরে স্থান পাওয়ার অপেক্ষায়। হুকবেদার মারা গেছে। হুঁকাবন্দীর মানে হুকাসাজানো এবং পরিবেশনকারী।

ঙ. পোশাক, অলঙ্কার ও প্রসাধনকেন্দ্রিক শব্দ

পোশাক, অলঙ্কার ও প্রসাধনকেন্দ্রিক শব্দের তালিকায় মহিলাদের প্রাধান্য অস্বীকার করবার উপায় নেই। এর পেছনে রয়েছে সমাজ-সংস্কৃতির চিরন্তন রীতিনীতি।

(১) পোশাক

(অ) পুরুষের পোশাক

প্রাচীন বাংলার পুরুষের পোশাক কী ছিল- গামছা, লেংটি, ফতুয়া নাকি অন্যকিছু? গ্রাম বাংলার অধিকাংশ পুরষের প্রিয় লুঙ্গি কি বার্মিজ প্রভাবিত? এসব প্রশ্ন নিয়ে এখন আর বির্তকের সুযোগ নেই। লুঙ্গি, গামছা, ফতুয়া শত শত বছর ধরে বাঙালিদের প্রিয় পোশাকের তালিকায় ঠাঁই করে নিয়েছে। কাজেই সামাজিক- সাংস্কৃতিক ভাবে এগুলোকে এখন আমাদের আত্মীকৃত আপন শব্দই বলতে হবে।

এসব পোশাকের সঙ্গে বাঙালি হিন্দুদের প্রিয় পোশাকের তালিকায় সংযোজিত হয়েছে সাদা ধুতি এবং একসময় বাঙালি মুসলমান বিশেষ করে মৌলভি মাওলানাদের পোশাকের তালিকায় সংযোজিত হয়েছিল আসকান, শেরওয়ানি, পায়জামা, পাঞ্জাবি, চোত পায়জামা, আলিগড়ি পায়জামা, নাগরা, নাগরা জুতা ইত্যাদি।

হজ্ব করার পর অনেকেই ব্যবহার করতেন পাগড়ি। এখনও বিয়ের দিন ধনী গরিব অনেক মুসলমান পরে থাকেন আসকান, মুগলাই পাগড়ি ইত্যাদি। মুসলমান পুরুষ বিশেষ করে আরবি শিক্ষিতগণ পরে থাকেন বিভিন্ন ধরনের টুপি। যেমন- কিস্তি টুপি, গোল টুপি, জিন্নাহ টুপি ইত্যাদি।

১৯৪০ দশকের শেষ পর্যন্ত অনেকেই পরতেন রুমি টুপি। মুসলিম ব্যবহৃত আসকান, মুগলাই পাগড়ি ইত্যাদি ইসলামি এবং মোগল সভ্যতা প্রভাবিত। জিন্নাহ টুপি পাকিস্তানের স্রষ্টা মোহাম্মদ আলীর জিন্নাহ ব্যবহৃত টুপি অনুসারে প্রচলিত হয়েছিল। রুমি টুপির পেছনে লুকিয়ে আছে মসনবি খেতাব কবি রুমির নাম।

রুমি টুপি সাধারণত লাল ধরনের ছোট বালতির আকারের এবং টুপির উপরে অংশের মাঝামাঝিতে একগুচছ সুতো ঝুলে থাকতো। হিন্দুদের ধুতি পরার বিশেষ কায়দার সঙ্গে একটি বিশেষ শব্দ সম্পর্কিত। শব্দটি হচেছ মালকোচা। ১৯৪৮ এর আগে মুসলমানদের মধ্যেও মালকোচা মেরে ধুতি পরার রেওয়াজ ছিল। অর্থাৎ সাধারণ পোশাক হিসেবে মুসলমানগণও ধুতি পরতেন।

সমাজ ও পরিবারকেন্দ্রিক শব্দ

আ) মেয়েদের পোশাক

বাঙালি মেয়েদের প্রিয় পোশাক শাড়ি মসলিন থেকে শুরু করে জামদানি, বেনারসি ও টাঙ্গাইল শাড়ির অনেক আকৃতি প্রকৃতি এবং প্রাসঙ্গিক শব্দাবলী রয়েছে। বেনারসি বলতে মূলত শাড়িকে বোঝানো হয় এবং বিয়ের শাড়িকে বোঝানো হয়। বেনারসি শাড়ি ছাড়া বাঙালি মধ্যবিত্ত উচ্চ মধ্যবিত্তের বিয়ে অকল্পনীয়।

ব্লাউজ অর্থে ঢোলি এবং এই ধরনের আরো কিছু শব্দ কষ্ট করে সংগ্রহ করা যাবে কিন্তু বাংলা শব্দ পাওয়া যাবে কী? এই কথার সরল অর্থ অধিকাংশ বাঙালি মহিলার মধ্যে বহুকাল ব্রাউজ পরার নিয়ম প্রচলিত ছিল না। বর্তমানে টপলেস, স্লিভলেস শব্দাবলীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

স্লিভলেস মানে হাতখোলা ব্লাউজ। টপলেস অর্থ উপরে দিকে খোলা ব্লাউজ। ঢোলি শব্দটি হিন্দি। কিন্তু নানা কারণে হিন্দি পোশাকের প্রভাব খুব বেশি একটা দেখা যায়নি। সম্প্রতি হিন্দু পোশাক নির্মাতাদের দক্ষতায় বিভিন্ন ডিশ বা স্যাটেলাইন এবং চ্যানেলের কল্যাণে এবং হিন্দি ছবির নায়িকাদের প্রভাবে বাংলা শব্দভাণ্ডারে সংযোজিত হয়েছে বেশকিছু নতুন শব্দ।

লেহেঙ্গা, থ্রিপিস, টুপিস । ১৯৬০ দশকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের মধ্যে ট্যাডি পোশাকের প্রচলন হয়েছিল। ১৯৭০ দশক ট্যাডিকে তাড়িয়ে স্থান করে নিয়েছিল বেলবটম। অন্যদিকে বাঙালি খ্রিস্টান মহিলাদের কেউ কেউ পরতেন মিনি স্কার্ট। শিক্ষিত বাঙালিদের আজকাল অনেকেই পরেন মেক্সি।

বোরখা এবং পর্দা নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে বাংলায়। পর্দানশীন শব্দের জন্ম হয়েছে পর্দা এবং নশীন মিলিয়ে। আজকাল পদার প্রতিশব্দ হেজার থেকে শুরু করে পনাকেন্দ্রিক বিভিন্ন শব্দ বাংলা শব্দভান্ডার সংযেজিত হয়েছে। বাঙালিদের পেশাকে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে বিদেশি সভ্যতা এবং বিদেশি শব্দের প্রভাব।

বাঙালি সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিশ্বাসী অধিকাংশ পুরুষ অনায়াসে পরেন ইংরেজ প্রভাবিত প্যান্ট, শার্ট, হাফশার্ট, ফুলশার্ট, ফুলপ্যান্ট, ন্যাকটাই এবং স্যুট কোট। বাঙালি মহিলাদের মধ্যেও আজকাল শাড়ির বদলে সালোয়ার কামিজ প্রীতি লক্ষ করা যাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে প্রচুর শিক্ষিত মহিলাকে প্যান্ট শার্ট পরে অফিস করতে দেখা যেতে পারে।

২. অপকার

অলঙ্কার নারীর সৌন্দর্য এবং মর্যাদার প্রতীক। বিয়ে বা সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে অলঙ্কারহীন কোনো নারীর উপস্থিতি আমরা ভাবতেই পারি না।

নারীদেহের বিভিন্ন অলঙ্কারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অলঙ্কার কেন্দ্রিক প্রচুর শব্দ। যেমন- খোপার কাঁটা, সিথি পাটি, টিকলি, টায়রা, মুকুট, চিক, হাসুলি, গোল খাড়ু, বাক খাড়ু, রাজু, চন্দ্রহার, সাতনলি, পাচনলি, মাদুলি, শঙ্খমালা, সীতাহার, মঙ্গলসূত্র, নেকলেস, কানফুল, কানবালি, কানপাশা, ঝুমকা, কানয়াকড়ি, ইয়ারিং, কানপাশা, চেইনটানা, ঝুমিকা, নাকফুল, নথ, নোলক, নাকবালি, চুড়ি, বালা, রুলি, ব্রেসলেট, রিস্টলেট, মানতাসা, কমরদানি, শঙ্খবিছা, নূপুর, ঘুঙুর, মল, চুটকি ইত্যাদি।

উল্লিখিত অলঙ্কারগুলো একসময় অভিজাত রমনীরা ব্যবহার করতেন। বর্তমানে নারীরা হালকা। ওজন এবং হালকা ডিজাইনের অলঙ্কার পরতে পছন্দ করেন। বর্তমান সময়ে আমরা যে অলঙ্কার দেখতে পাই তা হাজার বছরের বিবর্তিত রূপ। নৃবিজ্ঞানীদের মতে নারীর শৃঙ্খলের বিমুক্ত রূপই হচেছ অলঙ্কার।

তবে এ শৃঙ্খল যে প্রাচীনকালে নারীকে শৃঙ্খলিত করেছে তা নয়, দাসশ্রেণীর পুরুষও ছিল সে সময় শৃঙ্খলিত। যিশুখ্রিস্টের জন্মের দুবছর আগে রোমে দাসদের গলায় এক ধরনের মোটা আংটা পরানো হতো এবং তাতে খোদাই করে লেখা থাকত, আমাকে আটকে রাখ যাতে পালিয়ে না যাই।

তারই বিবর্তিত রূপ আজকের কন্ঠহার। ঠিক তেমনিভাবে পায়ের শৃঙ্খল হচ্ছে মল। কেননা একসময় মেয়েরা যখন ঘরের বাইরে না বের হতে পারে সেজন্য তাদের পায়ে পারিয়ে রাখা হতো মল। ঘরের বাইরে বের হলে শব্দ শুনে যেন তাকে চিহ্নিত করা যায়। হাতের শৃঙ্খল বালা। তাই অলঙ্কারকে এখনও মনে করেন মুক্ত শৃঙ্খল ।

(৩) প্রসাধন সামগ্রী

এসময় প্রসাধনসামগ্রী বলতে বোঝানো হতো স্নো, পাউডার, আলতা, কাজল, টিপ, লিপস্টিক, তেল ইত্যাদি। বর্তমানে প্রসাধনের ব্যবহারে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এগুলির ব্যবহার এখন অনেকাংশে কমে গিয়ে তার জায়গা দখল করে নিয়েছে বিদেশ থেকে আসা নানা ধরনের বিলাসবহুল প্রসাধনসামগ্রী।

যেমন- পারফিউম, মেকআপ, লিপলাইনার, রাশার, আইশ্যাডো, ম্যানিকিউর, প্যাডিকিউর, হেয়ার ড্রায়ার, হেয়ারক্রিম, আফটার শেভ, লিকুইড ম্যাকআপ। মূলত ইংরেজ এবং ইউরোপীয় সভ্যতা থেকে এই শব্দগুলো আগত। বর্তমানে আলতার ব্যবহার নেই বললেই চলে। তার স্থান দখল করে নিচেছ মেহেদি।

আরও দেখুন:

 

Leave a Comment