উর্দু হরফের স্বরূপ, যুক্তাক্ষর ও বিভিন্ন অবস্থানে রূপান্তর

উর্দু ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার একটি সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ভাষা, যার লিপি মূলত পার্সো-আরবি (Perso-Arabic) ধারা থেকে উদ্ভূত। উর্দু লিপি ডান দিক থেকে বাম দিকে লেখা হয় এবং এটি নাস্তালিক (Nastaliq) শৈলীতে লেখা হওয়ার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। উর্দু হরফের গঠন, তাদের অবস্থানভেদে রূপান্তর এবং যুক্তাক্ষর বা লিগেচারের ব্যবহার—এই তিনটি বিষয় উর্দু লিপিকে অত্যন্ত নান্দনিক ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে তুলেছে। এই প্রবন্ধে উর্দু হরফের স্বরূপ, যুক্তাক্ষর এবং বিভিন্ন অবস্থানে তাদের পরিবর্তিত রূপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

উর্দু হরফের স্বরূপ

উর্দু বর্ণমালায় মোট ৩৬–৩৮টি বর্ণ ব্যবহৃত হয় (প্রচলিত তালিকা অনুযায়ী), যা আরবি, ফার্সি এবং কিছু ভারতীয় ধ্বনির জন্য অতিরিক্ত অক্ষর যুক্ত করে গঠিত। উর্দু বর্ণমালার মূল ভিত্তি আরবি হলেও এতে ফার্সি থেকে গৃহীত কিছু বর্ণ যেমন پ (পে), چ (চে), ژ (ঝে), گ (গাফ) যুক্ত হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ এশীয় ধ্বনির জন্য ٹ, ڈ, ڑ, ں ইত্যাদি বর্ণ ব্যবহৃত হয়।

উর্দু হরফ সাধারণত তিন ধরনের ধ্বনি নির্দেশ করে:

  1. স্বরধ্বনি নির্দেশক বর্ণ (যেমন: الف, و, ی)

  2. ব্যঞ্জনধ্বনি নির্দেশক বর্ণ (যেমন: ب, ت, ج, ک)

  3. মিশ্র ধ্বনি বা সহায়ক চিহ্ন (যেমন: زবর, জের, পেশ)

উর্দুতে স্বরচিহ্ন (diacritics) সাধারণত লেখা হয় না; পাঠক শব্দের প্রেক্ষাপট থেকে উচ্চারণ বুঝে নেন। তবে প্রাথমিক শিক্ষা বা ধর্মীয় গ্রন্থে স্বরচিহ্ন ব্যবহৃত হতে পারে।

যুক্তাক্ষর বা লিগেচার

উর্দু লিপির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো যুক্তাক্ষর বা লিগেচার। বাংলা বা দেবনাগরীর মতো যুক্তব্যঞ্জনের আলাদা নিয়ম না থাকলেও উর্দুতে অক্ষরগুলো একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়ে নতুন আকৃতি তৈরি করে। একাধিক অক্ষর পাশাপাশি থাকলে তারা একটি ধারাবাহিক রেখার মতো যুক্ত হয়ে যায়।

উদাহরণ:

  • ک + ت + ا + ب → کتاب (কিতাব)

  • م + ح + ب + ت → محبت (মোহাব্বত)

এখানে প্রতিটি অক্ষর তার অবস্থান অনুযায়ী ভিন্ন রূপ ধারণ করে এবং একসাথে মিলিত হয়ে একটি লিগেচার তৈরি করে। উর্দু নাস্তালিক ফন্টে এসব লিগেচার অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে প্রকাশিত হয়।

কিছু অক্ষর যেমন: ا, د, ذ, ر, ز, و — এরা পরবর্তী অক্ষরের সাথে যুক্ত হয় না। ফলে শব্দের মাঝখানে এদের উপস্থিতি সংযোগ ভেঙে দেয়।

অবস্থানভেদে হরফের রূপান্তর

উর্দু হরফের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো অবস্থানভেদে রূপ পরিবর্তন। একটি বর্ণ শব্দের শুরু, মাঝখান বা শেষে ভিন্ন আকৃতি ধারণ করে। সাধারণত প্রতিটি বর্ণের চারটি রূপ থাকে:

  1. স্বতন্ত্র রূপ (Isolated form)
    যখন বর্ণটি একা থাকে।

  2. আরম্ভিক রূপ (Initial form)
    শব্দের শুরুতে থাকলে।

  3. মধ্যবর্তী রূপ (Medial form)
    শব্দের মাঝখানে থাকলে।

  4. শেষ রূপ (Final form)
    শব্দের শেষে থাকলে।

উদাহরণ হিসেবে ب (বে) বর্ণটি দেখা যাক:

  • একা: ب

  • শুরুতে: بـ

  • মাঝে: ـبـ

  • শেষে: ـب

এই অবস্থানভেদে রূপান্তরের কারণে উর্দু লেখা দেখতে প্রবাহমান ও নান্দনিক লাগে।

 সংযোগের নিয়ম

সব উর্দু বর্ণ একে অপরের সাথে যুক্ত হতে পারে না। কিছু বর্ণ কেবল পূর্ববর্তী বর্ণের সাথে যুক্ত হয়, কিন্তু পরবর্তী বর্ণের সাথে নয়। যেমন:
ا، د، ر، ز، و

এই বর্ণগুলোর পরে নতুন অক্ষর এলে তা আলাদা করে লেখা হয়। উদাহরণ:

  • اردو (উর্দু)
    এখানে ر এবং د পরবর্তী বর্ণের সাথে যুক্ত হয় না।

 

 

নাস্তালিক শৈলী

উর্দু লিপি সাধারণত নাস্তালিক ক্যালিগ্রাফিক শৈলীতে লেখা হয়। এই শৈলীতে অক্ষরগুলো ঢালু, তরঙ্গায়িত ও শৈল্পিকভাবে সাজানো থাকে। কম্পিউটার টাইপিংয়ে নাস্তালিক ফন্ট ব্যবহারের ফলে যুক্তাক্ষর ও রূপান্তর স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হয়।

শিক্ষায় গুরুত্ব

উর্দু হরফের রূপান্তর ও যুক্তাক্ষর বোঝা নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য কিছুটা কঠিন হলেও একবার নিয়ম বুঝে গেলে এটি সহজ হয়ে যায়। ভাষা শিক্ষায় নিচের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ:

  • প্রতিটি বর্ণের চারটি রূপ শেখা
  • কোন বর্ণ যুক্ত হয়, কোনটি হয় না—তা জানা
  • শব্দ গঠনের অনুশীলন করা
  • নাস্তালিক পাঠের অভ্যাস করা

উর্দু লিপি তার শৈল্পিক সৌন্দর্য, প্রবাহমান গঠন এবং যুক্তাক্ষরের বৈচিত্র্যের জন্য বিশ্বে অনন্য। প্রতিটি বর্ণের অবস্থানভেদে পরিবর্তিত রূপ উর্দু লেখাকে জীবন্ত ও নান্দনিক করে তোলে। উর্দু হরফের স্বরূপ, যুক্তাক্ষর এবং রূপান্তর নিয়ম সঠিকভাবে আয়ত্ত করলে ভাষাটি পড়া ও লেখা সহজ হয় এবং এর সাহিত্যিক সৌন্দর্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। উর্দু ভাষা ও লিপির এই বৈশিষ্ট্যগুলো দক্ষিণ এশীয় ভাষা-সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত।

Leave a Comment