এস্পেরান্তো : একটি নির্মিত আন্তর্জাতিক ভাষা

ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়—তা মানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার পরিচয়ও বটে। কিন্তু পৃথিবীতে হাজার হাজার ভাষা বিদ্যমান, যার ফলে যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া এবং মানব ঐক্যের পথে ভাষাগত বাধা একটি বাস্তব সমস্যা। এই বাধা দূর করার স্বপ্ন থেকেই জন্ম নেয় একটি অনন্য সৃষ্টি—এস্পেরান্তো (Esperanto)

এস্পেরান্তো হল একটি নির্মিত বা পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক ভাষা (constructed international language), যার উদ্দেশ্য ছিল ভিন্নভাষী মানুষের মধ্যে সর্বজনীন ও নিরপেক্ষ যোগাযোগের সেতু গড়ে তোলা—একটি ভাষা, যা কোনো জাতির অধিকারভুক্ত নয়, বরং পুরো মানবজাতির।

 

উদ্ভব ও ইতিহাস

এস্পেরান্তোর স্রষ্টা ছিলেন ড. লুডউইগ লাজারাস জামেনহফ (L. L. Zamenhof), জন্ম ১৮৫৯ সালে, বর্তমান পোল্যান্ডের বিয়ালিস্টকে (তখন রাশিয়ান সাম্রাজ্যের অংশ)। তিনি বড় হয়েছেন এমন একটি শহরে যেখানে পোলিশ, জার্মান, রুশ, ইহুদি, লিথুয়ানিয়ানসহ নানা জাতিগোষ্ঠী পাশাপাশি বাস করত, কিন্তু ভাষা-ভিন্নতার কারণে ভুল বোঝাবুঝি ও সামাজিক বৈষম্য ছিল স্পষ্ট।

এই বাস্তবতা তরুণ জামেনহফের মনে গভীর প্রভাব ফেলে—তিনি উপলব্ধি করেন, যদি সবাই একটি সাধারণ ও সহজ ভাষায় কথা বলতে পারে, তাহলে মানুষে-মানুষে বৈরিতা অনেকটাই দূর হতো।

১৮৮৭ সালে তিনি ‘Unua Libro (প্রথম বই)’ প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি তাঁর নতুন ভাষার নিয়ম, শব্দভাণ্ডার ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করেন—“Dr. Esperanto”, যার অর্থ “যিনি আশা করেন”। সেই আশাবাদী নামই পরে ভাষাটির নাম হয়ে যায়—এস্পেরান্তো।

 

ভাষাগত কাঠামো ও শব্দগঠন

এস্পেরান্তোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য তার সরলতা ও নিয়মিততা

  • এখানে কোনো অনিয়মিত ক্রিয়া (irregular verb) নেই।
  • প্রতিটি শব্দের লিঙ্গ, কাল, বচন ও বাক্যগঠন কঠোরভাবে নির্দিষ্ট নিয়মে চলে, তাই শেখা সহজ।
  • অক্ষরসংখ্যা ২৮, লাতিন বর্ণমালা ব্যবহার করা হয়।
  • উচ্চারণ ও বানান একে অপরের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ—যেমন লেখা হয়, ঠিক তেমনই পড়া হয়।

উদাহরণস্বরূপ—

  • “Amo” = ভালোবাসা
  • “Ami” = ভালোবাসা (ক্রিয়া রূপ)
  • “Amiko” = বন্ধু (-ik- যোগে বিশেষ্য তৈরি হয়)
  • “Amikeco” = বন্ধুত্ব (-ec- যোগে বিমূর্ত বিশেষ্য)

এভাবে খুব অল্প মূল শব্দ জানলেই হাজারো অর্থ প্রকাশ করা যায়।

 

এস্পেরান্তোর দর্শন ও নৈতিক উদ্দেশ্য

জামেনহফের উদ্দেশ্য কেবল একটি ভাষা তৈরিই ছিল না—তিনি এটি দেখেছিলেন মানব ঐক্য ও শান্তির ভাষা হিসেবে। তিনি একে বলেছিলেন “lingvo internacia” (আন্তর্জাতিক ভাষা), যা জাতি, ধর্ম, রাজনীতি বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকবে।

তিনি ‘হোমারানিজমো (Homaranismo)’ নামক এক ধারণা প্রচার করেছিলেন, যার মূল কথা—

“সব মানুষ, জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে, এক মানব পরিবারের সদস্য।”

এস্পেরান্তো সেই দর্শন বহন করে—একটি ভাষা, যা কাউকে ছোট বা বড় করে না, এবং কোনো জাতির সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে না।

 

শেখার সহজতা

ধারণা করা হয়, একজন সাধারণ শিক্ষার্থী ইংরেজি বা ফরাসি শেখার সময়ের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ সময়ে এস্পেরান্তো রপ্ত করতে পারে। এর কারণ—এর নিয়মগুলি নিয়মিত এবং ব্যতিক্রমহীন। আন্তর্জাতিকভাবে করা ‘Springboard to Languages’ নামক এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রাথমিক পর্যায়ে এস্পেরান্তো শেখা শিশুদের অন্যান্য বিদেশি ভাষা শেখার দক্ষতা বাড়ায়।

 

বিশ্বজুড়ে বিস্তার ও ব্যবহার

১৯ শতকের শেষ থেকে ২১ শতক পর্যন্ত এস্পেরান্তো বিভিন্ন ধাপে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।

  • বর্তমানে এটি ১২০টিরও বেশি দেশে ব্যবহৃত হয়।
  • অনুমান করা হয়, ২০ লাখেরও বেশি মানুষ এর মাধ্যমে যোগাযোগ করতে সক্ষম, এবং কমপক্ষে ২,০০০ থেকে ৩,০০০ মানুষ এটিকে মাতৃভাষা হিসেবে জানে (বিশেষত সেই পরিবারগুলোতে, যেখানে পিতা-মাতা উভয়েই এস্পেরান্তো ব্যবহার করেন)।
  • প্রতি বছর আয়োজিত হয় বিশ্ব এস্পেরান্তো কংগ্রেস (Universala Kongreso de Esperanto), যেখানে শতাধিক দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
  • গুগল, উইকিপিডিয়া, ডুওলিঙ্গো, এমনকি জাতিসংঘের কিছু স্বেচ্ছা ফোরামেও এস্পেরান্তো সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হয়।

এছাড়াও এর রয়েছে সাহিত্য, সংবাদপত্র, রেডিও, অনলাইন সম্প্রদায় এবং বিশাল অনুবাদভাণ্ডার।

 

এস্পেরান্তো সাহিত্য ও সংস্কৃতি

শুধু যোগাযোগের ভাষা হিসেবেই নয়, এস্পেরান্তো একটি সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক আন্দোলনেও পরিণত হয়েছে। এই ভাষায় লেখা হয়েছে অগণিত কবিতা, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ। অনূদিত হয়েছে শেক্সপিয়র, টলস্টয়, গ্যোথে, রবীন্দ্রনাথ, ডান্তে এবং দস্তয়েভস্কির মতো দিকপাল লেখকদের কাজ।

এই সাহিত্য ধারায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচয়িতা হিসেবে পরিচিত Julio Baghy (হাঙ্গেরি), William Auld (স্কটল্যান্ড), Kalocsay, Carter প্রমুখ। William Auld–এর La Infana Raso (The Infant Race) কাব্যগ্রন্থটি নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীতও হয়েছিল।

 

সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা

যদিও এস্পেরান্তোর উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত মানবিক, তবু এটি এখনও ব্যাপকভাবে ‘বিশ্বের দ্বিতীয় ভাষা’ হয়ে উঠতে পারেনি।

সমালোচকরা বলেন—

  • এর মূল শব্দভাণ্ডারের বেশিরভাগই ইউরোপীয় উৎস থেকে এসেছে, ফলে এটি ইউরোপীয় ভাষাভাষীদের জন্য সহজ হলেও এশিয়া, আফ্রিকা ও আদিবাসী ভাষাভাষীদের জন্য সমানভাবে নিরপেক্ষ নয়।
  • সংস্কৃতির গভীর রূপ প্রকাশে এটি কখনও কখনও ‘যান্ত্রিক’ বলে মনে হয়।

তবুও এর সম্প্রদায় এখনো সক্রিয়, এবং “ভাষাগত সাম্য ও সংস্কৃতিগত সহাবস্থান”–এর নীতি এর শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

 

বর্তমান যুগে এস্পেরান্তোর প্রাসঙ্গিকতা

একবিংশ শতাব্দী হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সংযোগের যুগ। বিশ্ব এখন এক ভার্চুয়াল গ্রাম। এ অবস্থায়, নিরপেক্ষ ও সহজ একটি আন্তর্জাতিক ভাষা–এর প্রয়োজনীয়তা নতুন করে অনুভূত হচ্ছে।

যদিও ইংরেজি বর্তমানে কার্যত ‘গ্লোবাল লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’, তবু ইংরেজি একটি জাতিগত ভাষা এবং এর প্রভাব বিশ্ব সংস্কৃতিতে একধরনের ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। এস্পেরান্তো এখানে একটি বিকল্প দর্শন—“ক্ষমতানিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা।”

অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যেমন Duolingo, YouTube, Telegram, এবং Reddit–এ নতুন প্রজন্মের অনেকেই আবার এস্পেরান্তো শেখা শুরু করেছে। এটি প্রমাণ করে, ভাষাটি এখনও মৃত নয়—বরং তার শান্ত ও সমানাধিকারভিত্তিক দর্শন আবার মানুষের আগ্রহ জাগাচ্ছে।

Leave a Comment