বাংলা ও উর্দুর তুলনামূলক উচ্চারণ বিশ্লেষণ

বাংলা ও উর্দু—দুটি ভাষাই দক্ষিণ এশিয়ার সমৃদ্ধ ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের অংশ। উভয় ভাষারই উৎস ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের ইন্দো-আর্য শাখায়, কিন্তু দীর্ঘ ইতিহাস, ভৌগোলিক বিস্তার, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং লিপিগত পার্থক্যের কারণে এদের উচ্চারণব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ মিল ও অমিল দেখা যায়। এই প্রবন্ধে বাংলা ও উর্দুর ধ্বনিতাত্ত্বিক কাঠামো, স্বরধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনি, উচ্চারণরীতি, জোর (stress), অনুনাসিকতা, এবং বিদেশি শব্দগ্রহণের প্রভাব নিয়ে একটি বিস্তৃত তুলনামূলক আলোচনা করা হবে।

ভাষাতাত্ত্বিক পটভূমি

বাংলা ভাষা প্রধানত পূর্ব ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে ব্যবহৃত। অন্যদিকে উর্দু ভাষা পাকিস্তান ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত এবং আরবি-ফার্সি প্রভাব বহুল। উর্দু ভাষা ফার্সি-আরবি লিপিতে লেখা হয়, আর বাংলা নিজস্ব ব্রাহ্মী উৎসজাত লিপিতে লেখা হয়। এই লিপিগত পার্থক্য উচ্চারণে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে।

স্বরধ্বনি (Vowel system) তুলনা

বাংলা স্বরধ্বনি

বাংলা ভাষায় সাধারণত ৭টি মৌলিক স্বরধ্বনি ধরা হয়:
অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, এ, ঐ, ও, ঔ (ব্যবহারিকভাবে ৭–৮টি ধ্বনি)

বাংলায় স্বরধ্বনির দৈর্ঘ্য (short vs long) অর্থভেদ করে না। যেমন:

  • বল / বাল — ভিন্ন অর্থ হলেও দীর্ঘতার কারণে নয়, বরং ভিন্ন ধ্বনির কারণে।

উর্দু স্বরধ্বনি

উর্দুতে স্বরধ্বনি দীর্ঘ ও হ্রস্ব—দুই ধরনের হয়:

  • /a/ বনাম /aa/

  • /i/ বনাম /ii/

  • /u/ বনাম /uu/

উদাহরণ:

  • “कल” (kal) বনাম “काल” (kaal) – দৈর্ঘ্য অর্থ বদলায়

তুলনা

বৈশিষ্ট্যবাংলাউর্দু
স্বরের দৈর্ঘ্যঅর্থভেদ করে নাঅর্থভেদ করে
স্বরের সংখ্যাতুলনামূলক কমবেশি বৈচিত্র্য
ডিফথংআছেআছে

বাংলা ভাষায় স্বরধ্বনি তুলনামূলকভাবে সমতল (flat), আর উর্দুতে দীর্ঘ স্বরের স্পষ্ট টান রয়েছে।

ব্যঞ্জনধ্বনি (Consonant system) তুলনা

বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনি

বাংলায় স্পর্শধ্বনি (plosive), ঘর্ষধ্বনি (fricative), নাসিক্যধ্বনি, অর্ধস্বর ইত্যাদি রয়েছে।
বাংলায় মহাপ্রাণ ও অল্পপ্রাণ ধ্বনির পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ:

  • ক / খ

  • প / ফ

  • ত / থ

তবে বাংলা উচ্চারণে অনেক সময় মহাপ্রাণ ধ্বনি দুর্বল হয়ে যায় (বিশেষ করে কথ্য ভাষায়)।

উর্দু ব্যঞ্জনধ্বনি

উর্দুতে আরবি-ফার্সি উৎসের বহু ধ্বনি আছে:

  • খ, গ़, क़, फ़, ज़, ह़ ইত্যাদি
    এগুলো বাংলা ভাষায় স্বাভাবিকভাবে নেই।

উদাহরণ:

  • ख़ुदा (khuda)

  • ज़मीन (zameen)

তুলনা

বৈশিষ্ট্যবাংলাউর্দু
আরবি-ফার্সি ধ্বনিকমবেশি
মহাপ্রাণ ধ্বনিআছেআছে
দন্ত্য বনাম মূর্ধন্যস্পষ্টস্পষ্ট
ঘর্ষধ্বনিসীমিতসমৃদ্ধ

উর্দুতে ফার্সি-আরবি প্রভাবে বেশি ঘর্ষধ্বনি ও গলার ধ্বনি ব্যবহৃত হয়।

উচ্চারণের ভঙ্গি ও ছন্দ

বাংলা

  • তুলনামূলকভাবে সমান ছন্দ

  • শব্দে জোর কম

  • স্বরপ্রধান ধ্বনি

  • বাক্যসুর মোলায়েম

বাংলায় stress বা জোর সাধারণত প্রথম অক্ষরে হালকা থাকে, তবে তা অর্থ নির্ধারণ করে না।

উর্দু

  • শব্দে নির্দিষ্ট stress থাকে

  • কবিতা ও গজলে ছন্দ গুরুত্বপূর্ণ

  • দীর্ঘ স্বর ও টান বেশি

উর্দু উচ্চারণে সুরেলা ওঠানামা (intonation) স্পষ্ট।

অনুনাসিক ধ্বনি

বাংলা:

  • ং, ঁ ব্যবহৃত

  • অনুনাসিকতা তুলনামূলক কম

উর্দু:

  • “ں” (nun ghunna)

  • নাসিক্য ধ্বনি গুরুত্বপূর্ণ

উদাহরণ:

  • “हूँ” (hun)

  • “मैं” (main)

উর্দুতে নাসিক্য ধ্বনি শব্দের অর্থ ও সৌন্দর্যে বড় ভূমিকা রাখে।

বিদেশি শব্দের প্রভাব

বাংলা

  • সংস্কৃত প্রভাব বেশি

  • ইংরেজি শব্দ গ্রহণে ধ্বনি বদলায়
    যেমন: স্কুল → ইস্কুল

উর্দু

  • আরবি-ফার্সি প্রভাব প্রবল

  • মূল ধ্বনি বজায় রাখার চেষ্টা
    যেমন: फ़िक्र, ज़रूर

 

 

লিপি ও উচ্চারণের সম্পর্ক

বাংলা লিপি:

  • উচ্চারণ-নির্ভর

  • একটি অক্ষর প্রায় একটি ধ্বনি

উর্দু লিপি:

  • আরবি-ফার্সি ভিত্তিক

  • একটি অক্ষরের একাধিক উচ্চারণ হতে পারে

  • স্বরচিহ্ন অনেক সময় লেখা হয় না

এ কারণে উর্দু শেখার সময় উচ্চারণ আলাদাভাবে শেখা প্রয়োজন।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

বাংলা উচ্চারণে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য খুব বেশি:

  • ঢাকাইয়া

  • চাটগাঁইয়া

  • পশ্চিমবঙ্গীয়

উর্দুতেও আঞ্চলিক পার্থক্য আছে:

  • দিল্লি উর্দু

  • লখনৌ উর্দু

  • করাচি উর্দু

তবে উর্দুতে “শুদ্ধ উচ্চারণ” ধারণা সাংস্কৃতিকভাবে বেশি গুরুত্ব পায়।

মিলের দিক

  • উভয় ভাষা ইন্দো-আর্য উৎসজাত

  • মহাপ্রাণ/অল্পপ্রাণ ধ্বনি আছে

  • স্বর-ব্যঞ্জন কাঠামো মিল রয়েছে

  • কবিতা ও সংগীতে ধ্বনির গুরুত্ব বেশি

 

 

অমিলের দিক

বিষয়বাংলাউর্দু
লিপিবাংলা লিপিফার্সি-আরবি লিপি
দীর্ঘ স্বরকম গুরুত্বপূর্ণখুব গুরুত্বপূর্ণ
আরবি-ফার্সি ধ্বনিকমবেশি
stressকমবেশি
নাসিক্য ধ্বনিসীমিতগুরুত্বপূর্ণ

বাংলা ও উর্দু—উভয় ভাষাই ধ্বনিগতভাবে সমৃদ্ধ এবং ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। তবে আরবি-ফার্সি প্রভাব, স্বরের দৈর্ঘ্য, নাসিক্য ধ্বনি, এবং stress ব্যবস্থার কারণে উর্দুর উচ্চারণ তুলনামূলকভাবে বেশি বৈচিত্র্যময় ও টানযুক্ত। বাংলা উচ্চারণ তুলনামূলকভাবে সমতল, মোলায়েম এবং স্বরপ্রধান।

Leave a Comment